
‘‘নরসিংদী যেন সহিংসতার অনল জ্বালিয়ে বসে আছে। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ আর পারিবারিক কলহ—এই ত্রিমুখী সংঘাতে জর্জরিত হয়ে উঠছে পুরো জেলা।
গত এক মাসেই জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ঘটেছে বারোটি খুন। ধর্ষণের শিকার হয়েছে শিশুসহ সাতজন নারী। শুধু গত আট দিনেই প্রাণ হারিয়েছেন সাতজন। বাড়ছে মানুষের আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর প্রশ্ন—নিরাপত্তা কোথায়?
তেরো এপ্রিল রাতে পলাশ উপজেলার কুমারটেকে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন কাভার্ডভ্যান চালক আহসান উল্লাহ। একই দিনে শিবপুরের ভরতেরকান্দি গ্রামে নিজ ঘর থেকে গৃহবধূ খাদিজা আক্তারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
বাইশে এপ্রিল, সদর উপজেলার আলোকবালিতে নিজ বাড়ির পাশেই কুপিয়ে হত্যা করা হয় স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বারকে। এর আগে উনিশে এপ্রিল ঝুলন্ত অবস্থায় রাজু মিয়া এবং আটারো এপ্রিল গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় মানছুরা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
দুই মে, পলাশের জয়নগর গ্রামে পুকুরে ভেসে উঠে স্কুলছাত্র হাবিব মিয়ার নিথর দেহ। আর রায়পুরায় আহত এসএসসি পরীক্ষার্থী রাজন শিকদার সেই দিনই ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
ছয় মে, রায়পুরার নজরপুরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে সাইফুল ইসলামকে গুলি করে ও রগ কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় আহত হন যুবক রাহাত।
পরদিন, সাত মে অপহরণের পর মুক্তিপণ না পেয়ে শুভ মোল্লাকে হত্যা করে ফেলে রেখে যায় অপহরণকারীরা। করিমপুরে একই দিনে তুচ্ছ ঘটনার জেরে প্রাণ হারান মোস্তফা মিয়া।
দশ মে, খিলপাড়ায় ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় দিনমজুর ইসমাইল হোসেনকে। সর্বশেষ, এগারো মে ভেলানগর থেকে শহিদুল ইসলাম সাকিবের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
হত্যা, ধর্ষণ কিংবা হামলা—নরসিংদীতে যেন প্রতিদিনই নতুন এক দুঃসংবাদ বয়ে আনছে। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি যেন ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
গত এক মাসে সাংবাদিকসহ অন্তত পনেরো জন আহত হয়েছেন বিভিন্ন হামলায়। নয় মে রাতে দেশ টেলিভিশনের সাংবাদিক মো. আকরাম হোসেন ও তাঁর পরিবার হামলার শিকার হন মহাসড়কের পাশে একটি সিএনজি স্টেশনে।
আট মে, মুক্তিযোদ্ধা তালিকা সংক্রান্ত একটি বিরোধে কুপিয়ে জখম করা হয় কিশোর মিনহাজুর রহমান শ্রাবণকে।
অপরাধের তালিকায় ধর্ষণও পিছিয়ে নেই। ছয় এপ্রিল খানাবাড়িতে ধর্ষণের শিকার হয় এক শিশু। আট এপ্রিল আট বন্ধুর নির্মম লালসার শিকার হয় দুই স্কুলছাত্রী।
এগারো এপ্রিল চলনা গ্রামে, আর পনেরো এপ্রিল ফকিরের চরেও ঘটেছে ধর্ষণের ঘটনা—সবই নাবালিকা ও অসহায় নারীর বিরুদ্ধে।
এই অস্থির পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন চন্দ্র সরকার জানান, প্রতিটি ঘটনাই তদন্তাধীন, এবং পুলিশ দায়ীদের গ্রেপ্তারে তৎপর।
তাঁর ভাষায়—“ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন, এর পেছনে পারিবারিক সহিংসতা, স্থানীয় কোন্দল, কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতাও রয়েছে। তবে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে।”
তবে প্রশ্ন রয়ে যায়—প্রতিরোধের এই চেষ্টায় কতটা কার্যকর হচ্ছে ব্যবস্থা?
কারণ, যে হারে বাড়ছে অপরাধ, সেই হারে তো কমছে না মানুষের আতঙ্ক।’
Leave a Reply